ধর্মরাষ্ট্র ও রাষ্ট্রধর্ম: এড. মিজানুর রহমান


রাষ্ট্রর সাথে ধর্মের সংমিশ্রন আর ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সংমিশ্রন এই দুই দর্শন বিশ্বব্যাপি সভ্যতাকে আরো বেশী জীবন ধর্মী করার চেষ্টায় ক্রিয়াশীল (active)। পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ কোন না কোন ধর্মের বিশ্বাসী।প্রত্যেকে তার নিজ নিজ ধর্মকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে বিশ্বাস করে এবং এই জীবন ও পরবর্তী জীবনের সুখের জন্য ধর্মের অনুশাষন মেনে চলে। যারা ধর্ম বিশ্বাস করে না তারাও এক প্রকার নিজেদের তৈরী করা বিশ্বাসকে লালন করে। ধর্মের সাথে অধর্মের বিরোধ থাকার কথা ছিল, কিন্তুু মানুষের অজ্ঞতা আর ধর্মের মনগড়া বিশ্লেষনের কারনে ধর্মের মতের সাথে অন্য ধর্মের মতালম্বীদের বিরোধ হয়েছে।
শ্রষ্টা তার প্রেরীত মাহামানবদের মাধ্যমে যখনই যে অঞ্চলে যে ধর্ম প্রেরন করেছেন, তখনই মানুষ সে ধর্মের সৌন্দর্য্য অবলোকন করেছেন এবং প্রথাগত ধর্ম ত্যাগ করে নুতন ধর্ম গ্রহন করেছেন। ভুল পথ থেকে মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য এবং ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে নিজ ধর্মকে জীবন বিধান হিসাবে মানুষ গ্রহন করেছেন। মানুষের এই বিশ্বাসের পরাবৈজ্ঞানীত অন্তর্নিহীত সৌন্দর্য্য আছে। মানুষের ব্যক্তি জীবন ধর্মীয় অনুশাষনের চাদরে আবৃত থাকলে মন্দের চেয়ে ভালোর দিক সবচাইতে বেশী।
অনেকে ধর্মের অনুশাষন ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন, ও রাষ্টিয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার অবিরাম সংগ্রাম ক্রিয়াশীল (active)। মহামানবগন নিজেরা কখনো ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন কিনা তাহা জানা যায় না। কেননা হিন্দু ধর্মে সত্য, ত্রেতা, দাপর, কলি, কোন যুগেই রাষ্ট্রপরিচালনার সনদ বেদ, গীতা, বা রামায়ন বা মহাভারত, ত্রিপিটককে রাষ্ট্রের সংবিধান হিসাবে ঘোষনা করা হয়নি। অন্যান্য ধর্মের বাইবেল,ইঞ্জিল, তাওরাত, সর্বশেষ ইসলামী রেনেসাতেও মদিনার সনদে প্রথম লিখিত সংবিধানে ধর্মরাষ্ট্র ঘোষিত হয়নি। আল-কুরআনকে সংবিধান হিসাবে ঘোষনা করা হয়নি। ধর্মের অনুশাষিত আদর্শিক ভাবে সকল ধর্মের প্রতি মানবীক উদারতার মনভাব নিযে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে।
ধর্মরাষ্ট্র তৈরী করার জন্য বিভিন্ন দেশে অনেক রাজনৈতিক দল নিজেদেকে ধর্মীয়-রাজনৈতিক দল হিসাবে প্রমান করার চেষ্টা করছেন। সম্পুর্ন ধর্মগ্রন্থ নয়, তার আদলে গঠন তন্ত্র তৈরী করে তারা প্ররিত পুরুষের ধর্মের নামে রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন।তদ্রুপ অনেক সংগঠন তারাও ধর্মরাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও চাওয়া ও প্রাপ্তির প্রত্যাশা একই। বাংলাদেশেও তাই। ধর্মরাষ্ট্র কায়েম করার সৈনিকরা সব সময় উগ্র।এই উগ্রতার কারন, তারা জানে সহজে মানুষ এই মতবাদ প্রতিষ্ঠায় সায় দিবে না, সুতরাং অস্র-সস্র ব্যাবহার করতে হবে।তার সাথে ধর্মগ্রন্থের বানী সংযোগ ঘটাতে হবে যেন মানুষ তাদের নিজ ধর্মগ্রন্থের বিপক্ষে অবস্থান নিতে না পারে।
ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামীরা নীজের সকল কর্মকান্ডের সাথে প্রেরিত পুরুষদের আচার আচরন ও ধর্মগ্রন্থের বানী সংমিশ্রন করে প্রয়োজনীয় অংশ সন্নিবেশিত করে একটি মিথ তৈরী করে অন্যদেরকে জীবন বিসর্জন দিয়ে ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্টা করাতে চায়। এই দর্শনকে খাঁটি দর্শন হিসাবে অনুসারীদের মাঝে বিশ্বাস স্থাপন করতে চেষ্টা করেন। ধর্মরাষ্ট্রের ধারনা প্রমানের উদাহরন পৃথিবীতে বিরল। রাজা-বাদশা বা অন্যান্য রাষ্ট্র প্রধানগন নিজ ধর্মীয় অনুশাষনের আদলে রাজ্য পরিচালনা করার চেষ্টা করেলেও ধর্মরাষ্ট্র কেউ ঘোষনা করেননি।
যারা ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা অদ্যাবধি সম্পুর্ন নিজ গ্রন্থের আলোকে ধর্ম ভিত্তিক একটি শাষন তন্ত্র তৈরী করতে পারেন নাই। খন্ডিত ছটি বই লিপিবদ্ধ করে অনুসারীদেরকে সম্মোহিত করে আদর্শের প্রতি বিশ্বস্থ করার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার শাষনতন্ত্র কি হবে, গনতন্ত্র,রাজতন্ত্র, সুলতানাত,প্রেসিডেন্সিয়াল,পার্লামেন্টারি সরকার কি রকম হবে তাহা নির্ধারন করতে পারেন নাই। রামরাজ্যের রুপরেখা কি?শাষন তন্ত্র রামের মত হবে নাকি আধুনিক গনতান্ত্রিক কল্যান রাষ্ট্রের মত হবে তাহার চুড়ান্ত লিখিত সংবিধান রচনা করা হয়নি।তেমনি খেলাফত শাষনতন্ত্র কি? এবং কোন খেলাফত সার্বজনীন ইসলামের ঐক্যবদ্ধ মতামতের ভিত্তিতে গ্রহনযোগ্য তাহাও স্পষ্ট নয়। তদ্রুপ ইসলামী রাষ্ট্রকায়েমের জন্য পৃথিবীর সকল সুসলমানদের সর্বসন্মত ঐক্যের ভিত্তিতে কোন শাষনতন্ত্র তৈরী করা সম্ভব হয়নি। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও তদ্রুপ।
সমাজ সন্মুখের প্রবাহমান। অতীত গৌরবগাঁথা সাফল্য ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শক। কোন রাষ্ট্রের নুতন শাষন ব্যাবস্থা যদি উন্নত ও জীবন ধর্মী না হয় মানুষ পূর্বের ব্যাস্থায় ফিরে যেতে চায় তবে রুপান্তরীত পদ্ধতির মাধ্যমে। পরীক্ষামুলক ভাবে সমাজতন্ত্র এক শত বছরের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু ধর্মের বয়স হাজার হাজার বছরের পুর্বে হওয়ায় মানুষকে হাজার বছরের পুরাতন ধর্মরাষ্ট্রের ব্যাবস্থায় ফিরে যেতে হবে। যাহা নিস্পত্তি করা দূরহ। আফগানিস্থানের মুজাহিদরা (তাদের মতে ইসলামী বিপ্লবে) জয় লাভ করেও সেই রকম একটি শাষন ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন। এই সংগ্রামে লক্ষ প্রান বিসর্জন দিতে হয়েছে। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ও ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্থানের শাষন পদ্ধতির সাথে মুসলমানদেন বাষট্টি দেশ একমত নয়। তাদের মতে রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)ইসলামে নেই।দেশ চলবে আল্লাহর আইনে।প্রজার কোন তন্ত্র গ্রহনযেগ্য নয়।
ধর্মরাষ্ট্রের সংগ্রামে অনেক অনুগামী জোগাড় করা সম্ভব বা সংগ্রাম সফল হওয়াও সম্ভব হতে পারে কিন্তুু বাস্তবায়ন(implementation) করা খুবই কঠিন। একটি রাষ্ট্রে অনেক ধর্মের মানুষ থাকে এবং নিজ ধর্মের মাঝেও বিভিন্ন মতবাদের আধ্যাত্মিক মতাদর্শের লোক থাকে।এই বিশাল অমিমাংশিত বিরোধ নিস্পত্তি না করে ধর্মরাষ্ট্র সৃষ্টি কঠিন।ধর্মে জবরধস্তি না থাকায় ভারত উপমহাদেশে মুসলমানরা শতশত বছর শাষন করেও ধর্মরাষ্ট্র কায়েম করা সম্ভব হয়নি বরং সকল ধর্মের গ্রহনীয় অসাম্প্রদায়ীক মানবীক মূল্যবোদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যতটুকু সাম্প্রদায়ীক ততটুকু রাজনৈতিক ব্যাক্তি সার্থে ধর্মরাষ্ট্রের ধারনা প্রসূত তৈরী হয়েছে।লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশী হয়েছে।
ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনবদ্ধ যুদ্ধে লক্ষপ্রান বিসর্যন দেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রও হারাতে হয়েছে ধর্মের উপর আঘাত এসেছে। অথচ ধর্মের উপর কালিমা লেপন করার কোন যুক্তি ছিলো না। উগ্রতার দর্শন ব্যর্থ হলে মানুষ অজ্ঞতায় ধর্মের উপর দোষ চাপাতে চায়।জঙ্গীবাদ কোন ধর্মীয় মতবাদ নয়। অথচ ধর্মোর নাম ব্যাবহার করে ধর্মের উপর কালিমা দেওয়া হয়েছে। বিধর্মীরা ছোট করে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।
রাষ্ট্র ও ধর্ম দুইটিকে সন্তুুষ্ট করার জন্যই রাষ্ট্রধর্মের ধারনা সৃষ্ট্রি করা হয়েছে।এই ধারনা যতটা ধর্মীক তার চেয়ে বেশী রাজনৈতিক। অনেকে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন রাষ্ট্রের যদি রাষ্ট্রভাষা থাকে, রাষ্টের যদি জাতীয় সঙ্গীত থাকে তাহলে রাষ্ট্রের ধর্ম থাকবেনা কেন? রাষ্ট্রর ধর্ম থাকবে ন্যায়দন্ড বা ইনসাফ। ইনসাফ আর ন্যায় দন্ডের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত থাকলেই সকল ধর্মই নিরাপদ থাকে। অধার্মীক, ধার্মীক, বিধর্মীর সকলের জন্য রাষ্ট্রকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দায়ীত্ব দেওয়া হলে সেই রাষ্ট্রই কল্যানকর রাষ্ট্রে পরিনত হয়।
কালের বিবর্তনে সর্ব প্রথম ইউরোপ ধর্মের বিভিন্ন মতাদর্শ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ধর্মকে ব্যাক্তি জীবনে স্বাধীন রাখা হয়েছে। রাষ্টপরিচালনার জন্য সকল জনগনের মতামতের ভিত্তিতে গনতন্ত্রের মত এক কল্যানকর শাষন ব্যবস্থা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যার সাথে ধর্মের অধর্মের বিধর্মের কোন বিরোধ নেই।শুধু ভোটই গনতন্ত্র নয়। আমারাই আমাদেরকে আমাদের জন্য নিয়োজিত করবো। রাষ্ট্রের প্রতিটি শাখায় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিস্থাপিত হবে।
বিচারক,ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,ম্যেজেষ্ট্রেট,শিক্ষক,আইনজীবি,শিল্পপতি,ব্যাবসায়ী, শ্রমজীবী সকলেই যোগ্যতায় প্রতিস্থপিত হবে। জ্ঞানীরা অজ্ঞদের ভার বহন করবে। সকলের জন্য ন্যায় বিচার সমান থাকবে। এই ধারনাই গনতান্ত্রীক কল্যান রাষ্ট্রের ধারনা। ন্যায় দন্ড বা ইনসাফ রাষ্ট্রের ধারনার ভিত্তিতে সংখ্যালঘু, দুর্বল, নিস্পেষিত, নিপিড়ীত, নির্যাতিত, অনগ্রসর,একজন মানুষের মানবাধিকার রক্ষাই ইনসাফ বা ন্যায় দন্ড। ধর্মরাষ্ট্র আর রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে তার চেয়ে ইনসাফ ও ন্যায়দন্ডের শাষিত সমাজ-রাষ্ট্র অধিক কল্যানকর হিসাবেই পৃথিবীতে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং রাষ্ট্রের ধর্ম হবে ন্যায়দন্ড বা ইনসাফ।
এড. মিজানুর রহমান,
জজ কোর্ট, লক্ষীপুর।