শেখ আবুল কাশেম মিঠুন স্মৃতি


শেখ আবুল কাশেম মিঠুন, একটি নাম একটি পরিবর্তন, একটি ইতিহাস, দুনিয়ায় চলচিত্রে যার নাম, ক্ষ্যাতি কানায় কানায় ভরা সে তিনিই আল-কোরআনের সান্নিধ্যে সকল কিছু ছেড়ে হয়ে উঠলেন একজন দ্বীনের দায়ী।
১৯৫১ সালের সাতক্ষীরা জেলায় জন্ম নেওয়া এই সহজ সরল মনের মানুষটি ২০১৫ সালের ২৫ মে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আজ প্রভুর সান্নিধ্যে ।
দেখতে দেখতে ৬ টি বছর হয়ে গেলো শেখ আবুল কাশেম মিঠুন আল্লাহ্র সান্নিধ্যে চলে গেছেন। আমার জীবন কথা যদি কখনো লেখার সুযোগ আসে সেখানে মরহুম শেখ আবুল কাশেম মিঠুনকে নিয়ে লেখার পরিসর একটু বড়ই হবে। সঙ্গীতাজ্ঞন, মিডিয়া , চলচ্চিত্র এগুলোকে আমার খুব কাছ থেকেই দেখা। দেশ সেরা সেলিব্রেটিদের দেখেছি,দেখেছি তাঁদের জীবন ধারা। একটু সুনাম সুখ্যাতির জন্য বিরামহীন চেষ্টা সাধনাও চোখে পড়েছে। দিন শেষে তাঁদের অনেকের হতাশা ও কষ্টের কথাও জেনেছি। দেখেছি বাইরে মেকাপযুক্ত সদা হাস্যজ্জল চেহারার পিছনের কান্না। আল্লাহ্র পুরো সৃষ্টি জগত যেখানে তাঁর বিধান অনুসরণ করে আমাদের জন্য সুন্দর এক পৃথিবী উপহার দেয় সেখানে সীমিত স্বাধীনতার নামে জীবনকে মনগড়া পথে চালিয়ে আমরা প্রকারান্তরে নিজের জীবনকেই বিষিয়ে তুলি। তাঁর দেখানো পথ থেকে যত দূরে যাই আমাদের সমস্যাটাও ততটুকুই বাড়ে। আমরা যাদের আইডল ভাবি সেই সব সেলিব্রেটিদের জন্যও বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য হবে। এদের মাঝে কারো কারো জীবনে পরিবর্তন চোখে পড়েছে। আমাদের দৈনন্দিন ইবাদতকে তারা জীবনের অনুষঙ্গ করেছেন। বিষয়টি উতসাহব্যাঞ্জক হলেও কেউ কেউ ধর্ম আর জীবন বা পেশাকে আলাদা করেছেন। সিনেমার সেটে নায়িকার সাথে একটি প্রেম বা নাচের দৃশ্য ধারণ করে নামাজের সময় ব্রেক দিয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের করেছেন কেউ কেউ। রমজানে পুরো একমাস শুটিং থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন কোন কোন সুপারস্টার,তারপর আবার ফিরে এসেছেন একই কাজে। তারা পেশা ও ধর্মকে আলাদা করেছেন। উপরের কথাগুলো এজন্যই আমার বলা, চলচিত্র অঙ্গনের সফল নায়ক, বাংলাদেশ চলচিত্র লেখক সমিতির এক সময়ের সভাপতি,চলচিত্রের অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার শেখ আবুল কাশেম মিঠুনকে এসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদাই পেয়েছিলাম । জীবনের আমুল পরিবর্তন হয়ে শতভাগ আল্লাহ্মুখী হয়ে যাওয়া ও জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত সেপথে অটল থাকা তাঁর মতো দ্বিতীয় একজন দেখিনি চলচিত্র অংগনে। মিঠুন ভাই লেখাপড়া জানা মানুষ ছিলেন। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান যেখানে ধর্ম আর পেশাকে আলাদা করার প্রয়োজন নাই। তিনি সেটা জানতেন এবং মানতেন। তাঁর জীবনের দৃশ্যমান এই পরিবর্তনের পর তিনি নিয়মিত লেখে গেছেন। সেখান থেকে দু একটি অংশ তুলে ধরলাম। শেখ মিঠূন লিখেছেন-
“ আমি যখন দেখলাম, ফিল্মে অন্য মেয়ের সাথে নায়িকা করে আমি অভিনয় করছি; যখন আমি চিন্তা করলাম আমার মেয়ে যদি এভাবে অভিনয় করতো তাহলে কি আমি তা পছন্দ করতাম? আমার অন্তর বললো, না; আমি তা কখনোই করতাম না। আমি সেদিনই চলচ্চিত্র বাদ দিয়ে দিয়েছি। অন্যের ব্যাপারে যা পছন্দ করছি তা আমি নিজের ব্যাপারে করতে পারছি না; এ কাজ আমি করব না। নিজের কাছে নিজেকে ছোট মনে হয়েছে।“
একই প্রবন্ধে তিনি আরো লিখেন
“ আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে, চলচ্চিত্র কেন ছাড়লেন? চলচ্চিত্র খারাপ কিসে? আমি বলি – ‘এই পৃথিবীতে যত প্রকার জাহেলিয়াত আছে; এই সমস্ত জাহেলিয়াতকে নিংড়ে, পিষে যদি এক ফোঁটা রস বের হয়; সেই এক ফোঁটা রস হবে ‘চলচ্চিত্র’। পৃথিবীতে ভোগ-বিলাস, অন্যের অধিকারহরণ, অনৈতিক যত কাজ আছে তা অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা ফিল্মের কাহিনীর মধ্যে সন্নিবেশিত করি। এই উপমহাদেশে গত ১০০ বছরে যে লক্ষ চলচ্চিত্র, লক্ষ-কোটি গান হয়েছে তার মধ্যে কি আছে? আমি বলি, এই গান-চলচ্চিত্রে রয়েছে ‘অবৈধ প্রেমকে উৎসাহপ্রদান, ব্যভিচার করতে উস্কানি’ এ ছাড়া এর মাঝে আর কিছুই নেই; যে পাপের কাজে আমিও লিপ্ত ছিলাম। কিন্তু আল্লাহপাকের কাছে হাজার শুকরান আদায় করি আমি তা ছাড়তে পেরেছি, পবিত্র কুরআন আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কল্যাণ-অকল্যাণের পথ।“
লেখক : সাইফুল্লাহ মানসুর