কুরবানী নিয়ে ইসলাম কি বলে ? কুরবানী কার উপর ওয়াজিব? কুরবানি কখন ওয়াজিব? যেসব প্রানী দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়! কুরবানির গোশতের ও ছামড়ার হুকুম ।


কুরবানি মুসলমানদেরকে মনে করিয়ে দেয় হযরত ইসমাইল (আঃ) এর আত্মত্যাগের কথা
আমাদের উচিত আল্লাহর দরবারে উত্তম পশু কুরবানির মাধ্যমে আত্মত্যাগের নযরনা পেশ করা। আমরা কুরবানীকে শুধু কুরবানী ভাবলে চলবে না, বরং এটি আমাদের শিখায় প্রিয় বস্তুটিকে কিভাবে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করা যায়। তাই কুরবানির প্রয়োজনীয় কিছু মাসয়ালা , যা মুসলমানদের কুরবানী কে সহজ ও সুন্দর করে তুলে ।
প্রথমত : জেনে নেওয়া যাক কুরবানী কার উপর ওয়াজিব, কুরবানি ঐ ব্যক্তির উপর ওয়াজিব যে মুসলমান, মুকিম , স্বাধীন, নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক রয়েছে যার, কুরবানী ব্যক্তির ছয় বছর পূর্ণ হওয়া, অনুপস্থিত হওয়া ।
দ্বীতিয়ত : কুরবানি কখন ওয়াজিব? কুরবানির ওয়াজিব হওয়ার সকল শর্ত যদি কোন ব্যক্তির নিকট জিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ সুবহে সাদিকের পূর্বে পাওয়া যায় তখন তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। যেসব প্রনী দ্বারা কুরবানী বৈধ যেমন, উট, গরু, মহিষ , ছাগল , দুম্বা , ভেড়া, উল্লেখিত ছয় প্রকারের প্রানী ব্যতীত অন্য কোন প্রানী দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়। কুরবানী পশুর বয়স, কুরবানী শুদ্ধ হওয়ার জন্য কুরবানির পশুর বয়সের সীমা নিম্নরূপ,
১। উটের বয়স পাঁচ বছর হতে হবে, এর কম হলে কুরবানী শুদ্ধ হবে না।
২,গরু ও মহিষের বয়স দুবছর পূর্ন হতে হবে, এর চেয়ে কম হলে হবে না।( কেননা রাসুল সাঃ এরশাদ করেছেন তোমরা দুই বা ততোধিক বয়সের পশু দ্বারা কুরবানী করো)
৩, ভেড়া, দুম্বা ও দুই গলের বয়স কমপক্ষে এক বছর পুর্ন হতে হবে, তবে ছয় মাসের মোটা তাজা বাচ্চাকে যদি এক বছরের বাচ্চার মতো দেখায়, তাহলে তা দ্বারা কুরবানী শুদ্ধ হবে। ( রাসুল সাঃ বলেছেন, ছয় মাসের দুম্বা একবছরের বকরির তুলনায় যথেষ্ট)।
তৃতীয়ত : যেসব প্রানী দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়ঃ ইসলামী আইন শাস্রবীদদের মতে, উট, গরু, ছাগল দুম্বা, মহিষ ও ভেড়া এছয় শ্রেণির পশু দ্বারা অন্য কোন প্রাণী, দিয়ে কুরবানী করলে তা বৈধ হবে না যেমন, হরিন। উল্লিখিত ছয় শ্রেণির প্রানী নির্দিষ্ট বয়স সীমায় উপনীত না হলে। যে পশুর উভয় চোখ অন্ধ। যে পশুর এক চোখ অন্ধ। লেংড়া কিংবা খোঁড়া পশু যা কুরবানির স্থানে হেঁটে যেতে পারে না। অতিশয় দুর্বল পশু, দাঁত হীন পশু, যে পশু জন্মগত ভাবে কান হীন, যে পশুর স্তনের মাথা কাটা, যে পশু ময়লা আবর্জনা ও পয়খানা খেতে অভ্যস্ত, যে পশুর একতৃতীয়াংশ কান কাটাঁ , যে পশুর সামনের পা কাটাঁ, যে পশুর পিছনের পা কাটাঁ, যে পশুর একতৃতীয়াংশ লেজ কাটাঁ, উল্লেখিত ত্রুটি যুক্ত প্রাণী দ্বারা কুরবানী বৈধ নয়।
চতুর্থ : কুরবানির গোশতের হুকুম : কুরবানির গোশত কুরবানিদাতা নিজে খাবে এবং অন্যদেরকে খাওয়াতে পারবে। ইচ্ছা অনুযায়ী আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের দান করতে পারবে। একতৃতীয়াংশ গরিবের মাঝে দান করে দেওয়া মুস্তাহাব। পরিবারের সদস্য বেশি হলে দান না করাও মন্দ নয়। কুরবানির গোশত সংরক্ষণ করে রাখা বৈধ। কুরবানির গোশত বিক্রয় করা বৈধ নয়। কুরবানির পশুর গোশত দ্বারা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা বৈধ নয়। কুরবানির গোশত আত্মীয়, অনাত্মীয়, ধনী গরিব, মুসলিম, অমুসলিম সকলকে খাওয়ানো বৈধ। অংশীদারদের ক্ষেত্রে গোশত বন্টনে সমতা রক্ষা করতে হবে। ওজন করে গোশত বন্টন করতে হবে। গোশত বন্টনে ইচ্ছাকৃত ভাবে কমবেশি করলে সকলের কুরবানি বাতিল হয়ে যাবে। তবে গোশতের সাথে হাড় চামড়া যুক্ত থাকলে সে ক্ষেত্রে অনুমান করে বন্টন করা বৈধ। এতে অনিচ্ছাকৃত ভাবে কমবেশি হলে অবৈধ হবে না।
৫ম : কুরবানির চামরার হুকুম, কুরবানির পশুর চামড়ার হুকুম সম্পর্কে ইসলামী আইনের শাস্রবীদদের মতে, কুরবানির পশুর চামড়া সদকা করে দেওয়া, চামরা দ্বারা ব্যবহার করা (বৈধ)। যেমন- জুতা, ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি করে নিজে ব্যবহার করা। কুরবানি চামড়ার বিনিময়ে এমন দুই ব্যবহার করা যাবে না, যা পরিবর্তিত হয়ে উপকার আসে, যেমন- গাদা ও নগদ অর্থ। চামড়ার বিনিময়ে দ্রব্য গ্রহণ করা যাবে, যা পরিবর্তিত হওয়া ব্যতীত সরাসরি উপকারে আসে। যেমন- চাদর, জুতা, মোজা ইত্যাদ। কুরবানির চামড়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করলে তা মাছারিফুজ জাকাত এর মাঝে বন্টন করতে হবে। নিজেরা ব্যবহার করা হারাম। অংশীদারদের সর্ব সম্মতিক্রমে চামড়া বন্টন করে নিজেরা ব্যবহার করতে পারবে।
লেখক, মাওলানা আব্দুল মান্নান
সহকারী মৌলভী, রায়পুর কামিল মাদ্রাসা
রায়পুর, লক্ষ্মীপুর।